আমাদের জাতীয় ভাষা সংগ্রাম ’৫২
তাহমিনা শারমিন
“বাংলা আমার ভাষা
বাংলা আমার সুখ
আমার প্রিয় ভাষা
বাংলা প্রানের ভাষা।
গানের প্রথম কলি যেমন
বাংলা ভাষা তেমন,
ষড়ঋতুর বাংলাদেশ
আছে সবার প্রাণে মিশে।
বাংলা ভাষার গান
বাংলা আমার প্রাণ
বাংলা আমার জীবন মরণ
বাংলায় গাই গান।’’- তাহমিনা শারমিন..
ভাষা আন্দোলন দিবস বা শহীদ দিবস, আমাদের
স্বাধীন বাংলাদেশে পালিত একটি জাতীয় উৎসব। ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষা আন্দোলনের সময়
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়ার লক্ষ্যে আন্দোলনরত শহীদদের প্রতি যথাযথ সম্মান
প্রদর্শণের জন্য এই দিবসটি পালন করা হয়। আবহমান বাংলার বীরত্বগাথাঁ স্মৃতিতে চির
অম্লান। আমাদের জাতীয় সংগ্রাম ’৫২ থেকে একাত্তর পর্যন্ত গড়িয়েছিল। স্বাধীনতা সংগ্রাম: এ
সংগ্রাম ভাষার স্বাধীনতা অর্যনের সংগ্রাম, এ সংগ্রাম আমাদের স্বার্বভৌমত্বের
সংগ্রাম। অনেক ত্যাগ আর রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি আজকের স্বাধীনতা। এ স্বাধীনতা
আমাদের কথা বলার স্বাধীনতা। মায়ের ভাষায় নিজের মনের ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা।
বাংলার ভাষা সংগ্রামের কথা:
অবিভক্ত ভারতে আমাদের দুই প্রধান বাঙালী নেতা শেরে বাংলা এ
কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তাদের রাজনীতিকে ইচ্ছা থাকা সত্বেও
আবহমান বাংলার সাংস্কৃতিক অঙ্গন অবলম্বনে সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িকতার পরিনতি দান
করতে নানা বাধার সম্মুখিন হয়ে চতুর জিন্নাহ্ সাহেবের দ্বারা প্রতারিত হয়েছেন।
১৯৪০ সালের ২৩ শে মার্চ লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন শেরে
বাংলা একে ফজলুল হক। এ প্রস্তাবই পাকিস্তান প্রস্তাবে রুপ পায়। তখন এমতাবস্থায়
উপনিত হয় যে, পশ্চিম পাকিস্তানে মোহাজের আন্দোলনে জিন্নাহ্ বিরোধী স্লোগান হচ্ছিল রাজপথে।
সীমান্তগান্ধী গাফফার খায়েরা জিন্নাহ্র বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। সমগ্র ভারত
উপমহাদেশে তখন বাংলা প্রদেশে মুসলিম লীগ যৌথভাবে সরকার গঠন করে প্রভাব প্রতিষ্ঠত
করেছে সর্বাধিক। বাংলার গুরুত্বও সাংঘাতিক। বাঙালী তো, প্রধানমন্ত্রী
শেওে বাংলার গুরুত্বও তখন সীমাহীন। শেরে বাংলার গুরুত্ব দিয়েই পাকিস্তান
প্রস্তাবনার মাধ্যমে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ভিত গড়া হয়। বাংলার আরেক প্রধানমন্ত্রী
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে আবুল হাশিম ও যুবনেতা শেখ মুজিবকে
সঙ্গে নিয়ে সাংগঠনিক প্রতিভা ও পরিশ্রমের পরিচয় দিয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য
গণভোট সংগ্রহ করেন। শেরে বাংলা বলেছিলেন, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলসমূহ
স্বাধীন হবে। জিন্নাহ্ ‘অঞ্চলসমূহ’ কেটেঁ দিয়ে ১৯৪৬ সালের দিল্লী দলীয় কনভেনশনে শুধু ‘ অঞ্চল’ বলে
চালিয়ে দেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তা সমর্থন করেন। ১৯৪০ সালের প্রস্তাবক ছিলেন
বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা, ১৯৪৬ সালের পাকিস্তান প্রস্তাবক হলেন বাংলার আরেক
প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।
১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর, বাংলা ভাষার ৪ কোটি ৪০ লাখ জনগন
পূর্ব বাংলার অংশ হয়ে যায়এবং পাকিস্তান অধিনরাজ্য হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে।
পাকিস্তানের সরকার,
প্রশাসন, সামরিক বাহীনিতে পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্য দেখা দেয়। ১৯৪৭
সালে পাকিস্তানের করাচিতে জাতীয় শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে রাস্ট্রভাষা এবং স্কুল ও
মিডিয়াতে ব্যবহার করার প্রস্তাব করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে এর প্রতিবাদ করা হয়। ঢাকায়
ছাত্ররা ( তমদ্দুন মজলিস )- এর প্রতিষ্ঠাতা আবুল কাশেমের নেতৃত্বে র্যালি বের
করে। বৈঠকে বাংলাকে পাকিস্তানের সরকারী ভাষা এবং পূর্ব বাংলার শিক্ষার মাধ্যম করার
সিদ্ধান্ত হয়। তবে,
পাকিস্তান পাবলিক সার্ভিস কমিশন অনুমোদিত বিষয় তালিকা থেকে
বাংলাকে বাদ দেয় এবং একই সঙ্গে কারেন্সি নোট এবং স্ট্যাম্প থেকে বাংলা মুছে ফেলা
হয়। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র
রাষ্ট্রভাষা করতে ব্যাপক প্রস্তুটি নেন। এতে পূর্ব পাকিস্তানের জনগন বিক্ষুদ্ধ হয়
ও বাঙালী ছাত্রদের একটি বিরাট অংশ আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাকে একটি সরকারী ভাষার
দাবিতে ১৯৪৭ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে জমায়েত হয়। এজন্য
ছাত্ররা ঢাকায় মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করে।
১৯৫২ সালে, পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালী ছাত্র জাতীয় ভাষা হিসেবে উর্দু
ঘোষণা করার প্রতিবাদে ভাষার স্বাধীনতার জন্য পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার
হয়ে ওঠে।
পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক ছিল বাঙালী, মোট
নাগরিকের (১৯৫২’র হিসাবে) প্রায় ৫৪%। এর প্রকিবাদে বিভিন্ন ছাত্র নিজেদের ও ভবিষ্যত প্রজন্মের
জন্য বাংলা ভাষা রক্ষার জন্য জীবন দান করেন। ২১ শে ফেব্রুয়ারী, ১৯৫২।
সকাল ৯ টায়, ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে জড়ো হতে থাকে।
সশস্ত্র পুলিশ বেষ্টিত ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং অন্যান্য
কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সোয়া ১১ টার দিকে, ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় গেট জুড়ে
সমবেত হয়ে প্রতিবন্ধকতা ভাঙার চেষ্টা করে। ছাত্রদের একটি দল ঢাকা মেডিকেল কলেজের
দিকে দৌড় দেয় এবং বাকিরা পুলিশ পরিবেষ্টিত ক্যাম্পাসে মিছিল করে। উপাচার্য পুলিশকে
গুলি চালাতে বন্ধ এবং ছাত্রদেরকে এলাকা ছেড়ে চলে যারার আদেশ দেন। এক পর্যায়ে ছাত্ররা চলে যাবার সময়
পুলিশ তাদেরকে গ্রেফতার করে। এ খবরে কিছু ছাত্র ব্যাপক বিক্ষুদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ
জানায় ও গনপরিষদে তাদের ভাষার প্রস্তাব পেশ করে। এক সময় পুলিশ ছাত্রদের ওপর গুলি চালায়
এবং তাতে শহীদ হন সালাম,
রফিক, বরকত, জব্বার সহ নাম না জানা অনেক ছাত্র। কত কত মায়ের বুক খালি করে, কত বোনের
আদরের ভাই অকাতরে বিলিয়ে দিল নিজের প্রাণ, শুধূ মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার জন্য ।
৫২‘র ২১ শে ফেব্রুয়ারীতে ‘বাংলা ভাষা আন্দোলন’-এ শহীদদের সম্মানে নির্মিত হয় শহীদ মিনার। প্রতি বছর ২১ শে ফেব্রুয়ারীতে এ
দিবস পালন করা হয়। এ দিন জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। প্যারেড , জাতীয়
সঙ্গীত ও আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো.. গান গাওয়া হয়। এ দিনে রাষ্ট্রপতি ও
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ বক্তব্য রাখেন এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা
হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, শহীদ মিনার, শাহবাগ, চারুকলা, পাবলিক
লাইব্রেরী, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ বিভিন্ন মিডিয়াতে দিনভর নানা অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। গান, কবিতা, নৃত্য, নাটক
ইত্যাদির মাধ্যমে বাংলার সাহিত্য ও ভাষার সংস্কৃতি তুল ধরা হয়। আমরা পেলাম আমাদের
ভাষার স্বাধীনতা। পেলাম মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার। এমন মধুর ভাষা ‘বাংলা’ ।‘ মা’ যে ডাকে
জুড়ায় মা ও সন্তানের প্রাণ। সে ভাষা রক্ষার্থে আসুন আমরা সবাই বাংলার শুদ্ধ
ব্যবহার ও প্রয়োগ করি।



কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন