সমাধান
সোহায়েল
হোসেন সোহেল
অযত্নে-অবহেলায়-অনাদরে
নাম না জানা অসংখ্য ঘাস লতা-পাতার মধ্য থেকে মাথা উঁচু করে যখন পাশের আম গাছটার
একটা ডাল জড়িয়ে ধরল;
তখন বাড়ির সবার নজর পড়ল কুমড়ো গাছটার উপর। সবাই বুঝতেও
পারলো কুমড়ো গাছটা বেশ বড় হয়েছে। বীজটা কে কখন পুতেছিল, তা যেমন
কেউ মনে করতে পারেনা,
তেমনি কেউ জোর করে বলতেও পারে না- ‘বীজটা সে
পুতেছিল’। কোন রকম যত্ন আত্তি ছাড়াই গাছটা যেভাবে বাড়ছিল, তাতে
বাড়ির লোকতো বটেই;
আশেপাশের লোকজনও বলছিল-বাহ! গাছটাতো খুব সুন্দর হয়েছে।
গাছটার
বয়স বাড়তে লাগল, ফুল আসল। কিছুদিনের মধ্যে কুমড়োর জালিও (ছোট কুমড়ো) দেখা গেল কয়েকটা । বাড়ির
লোকজন, আশেপাশের লোকজন দেখে খুব খুশি হল ।
কিন্তু
বাড়ির দুই বউ মনে মনে অন্য হিসাব আরম্ভ শুরু করলো । বড় বউ ভাবছিল, আম গাছটা
তার। তাই কুমড়ো যা হবে তার ভাগবটোয়ারা সে
নিজের হাতেই করবে। মেঝো বউ ভাবছিল, যায়গাটা তাদের। তাই কুমড়ো সে
যেভাবে ভাগ করবে,
সবাইকে তাই মেনে নিতে হবে।
এ হিসাব
চলছিল মনে মনেই, সবার অগোচরে। যে গাছটাকে নিয়ে এত জটিল হিসাব নিকাশ, সেই
কুমড়ো গাছ কিন্তু জানতেও পারলোনা যে তাকে নিয়ে এত জটিল হিসাব-নিকাশ চলছে। মানুষের
মনোদৈহিক জটিল জীবন যন্ত্রণার কতটুকুই বা সে বোঝে! তার বোঝার ক্ষমতাই বা কতটুকু।
তাই সে তার নিজের কাজ ঠিকই করে যাচ্ছিল। শিকড়গুলো মাটি থেকে রস আস্বাদন করে
গাছটাকে খাদ্য যোগান দিচ্ছিল । পাতা তার সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া ঠিক রাখল। ফলে
দিনে দিনে পূর্ণতা পাচ্ছিল গাছটি। কুমড়োর সংখ্যাও দিন দিন বাড়তে লাগলো। বাড়ির দুই
বউয়ের মনের যন্ত্রণাও কিন্তু থেমে থাকলো না । এভাবেই চলছিল বেশ।
কয়েকদিন
পরের কথা । একদিন সকাল। মেঝো বউয়ের রান্নাঘরে রান্না করার মতো কোন তরকারী ছিল না।
তাই সে চিন্তা করলো,
একটা কুমড়ো ছিড়ে রান্না করবে। হলোও তাই। কুমড়ো মেঝো বউয়ের
বটির ধারে টুকরো টুকরো হয়ে কড়াইতে উঠে খাদ্য উপযোগী হবার আগেই বাঁধল বিপত্তি। বড়
বউ টের পেল, কুমড়ো ছেড়া হয়েছে। সেটা কিছুতেই সে মেনে নিতে পারলো না । এক কথা, দুই কথা
হতে হতে শুরু হলো ঝগড়া। সেটা একসময়ে তুমুল পর্যায়ে পৌঁছল। কুমড়ো নিয়ে ঝগড়া শুরু
হলেও সেটার শাখা প্রশাখা গজাতে গজাতে এমন পর্যায়ে পৌঁছল যে, কুমড়ো আর
কারো খাওয়া হলোনা। মেঝো বউ রান্না করা কুমড়ো নিয়ে পুকুরে ফেলে দিল। একসাথে
থাকাবস্থায় যেসব কথা এতদিন বলতে পারেনি, সেসব কথাও উঠে এলো ঝগড়ার ভিতর। কে
কবে রান্নায় তৈল একটু বেশি খরচ করেছে, কে দোকানে চাউল বিক্রি করেছে, কে তার
সন্তানকে দুধের সর তুলে খাইয়েছে ইত্যাদি, ইত্যাদি ...।
কিছুদিন
পরের কথা । বাড়ির কাজের লোক গরু বের করছিল। দুই গরু একসাথে ছেড়ে দিয়ে আরেকটাকে সে
পানি খাওয়াচ্ছিল। গরু দুইটি বাড়ির মধ্য থেকে বের হয়ে এসে আমগাছটার তলায় গিয়ে একটু
সময় দাঁড়াল। তারপর দুই বউয়ের সব হিসাব
নিকাশের অবসান ঘটিয়ে সোজা গিয়ে কুমড়ো গাছ খাওয়া আরম্ভ করলো । কাজের লোক যখন বাইরে
আসলো, তখন কুমড়ো গাছের অর্ধেক গরুর পেটে, আর কিছু মুখে। গাছে কুমড়োর যে
শাখা প্রশাখাটুকু ছিল,
তা যেন বাড়ির দুই বউয়ের দিকে শূণ্য থেকে দৃষ্টি মেলে মিট
মিট করে হাসছিল।
![]() |
লেখক পরিচিতি : সোহায়েল হোসেন সোহেল
ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক,মিরপুর, ঢাকা।



কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন