এনায়েত হোসেন সোহেল : দারুণ
মজার খাবার শুটকি। বাংলাদেশে উৎপাদিত শুঁটকির একটি বড় অংশ উৎপাদন হয় কক্সবাজারে।
শুধু কক্সবাজারের মানুষই নয়, দেশ-বিদেশের ভোজনপ্রিয় মানুষের কাছে আকর্ষণীয় খাবার শুঁটকি।
আগে দামে সস্তা ছিল। তারপর গরিব মানুষের অন্যতম খাবার ছিল শুঁটকি। কিন্তু এই
শুঁটকি এখন বড়লোকদের খাবার টেবিলেও জায়গা করে নিয়েছে। এর যে দাম তাতে ভিরমি খাওয়ার
উপক্রম। ফলে শুঁটকি এখন রাজকীয় খাবারে পরিণত হয়েছে। শুঁটকি এখন গরিবের খুপড়ি ঘর
ছেড়ে উঠেছে বিলাসবহুল তারকা হোটেলের দামি মেনুতে। চড়া দামের কারণে শুঁটকি
মধ্যবিত্ত ও গরিবের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। আগে কক্সবাজারে বেশ কয়েকটি
শুঁটকির গ্রাম ছিল। কিছু দরিদ্র মানুষ শুটকি তৈরি ও বিপণনের সঙ্গে জড়িত ছিল। এখন
শুঁটকি উৎপাদন হয় বাণিজ্যিকভাবে।
শুঁটকি
বিক্রির জন্য একসময় কক্সবাজারের টেকপাড়া, রুমালিরছড়া, কানাইয়ার
বাজার ও বিমান বন্দর সড়কের মুখে ফুটপাতে বেশকিছু দোকান ছিল। এখন এর পাশাপাশি
বিক্রিতে এসেছে আভিজাত্য। পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ বার্মিজ মার্কেটের অভিজাত দোকান, হোটেল-মোটেল
জোন, লাবণী বিচ মার্কেট,
কলাতলীসহ বিভিন্ন পয়েন্টে দেখা যায় সুদৃশ্য শুঁটকির দোকান।
দেশি-বিদেশি পর্যটকরা এসব দোকান থেকে শুঁটকি সংগ্রহ করেন। গত ১৩ই ফেব্র“য়ারী ২০১০ বন্ধু টিপুকে নিয়ে
গিয়েছিলাম টেকনাফে। উদ্দেশ্য টেকনাফ পৌরশহরের কুড়ালপাড়ার বন্ধু আমান উল¬াহর বিয়েতে উপস্থিত হওয়া। অনেক দিনের পুরানো বন্ধু সে। না গিয়ে উপায় নেই। তাই
যাওয়া আর কি। সেই সাথে সেখানকার বিয়ের অনুষ্টান আর আমাদের সিলেট অঞ্চলের বিয়ের
অনুষ্টানের তফাৎ নিরুপন করা। যাই হোক গায়ে হলুদ,বিয়ে,বৌভাত এ
সকল অনুষ্টানের সাথে আমাদের অনেক তফাৎ রয়েছে। দেখলাম,খেলাম,ঘুরালাম।
অতঃপর চলে আসার সময় ভাবলাম একটি দিন কক্রবাজার ঢু মেরে যাই। কক্রবাজারের বন্ধু
আমজাদকে জানালাম আমরা আসছি। ও আমাদের সবকিছু বুকিং করে রাখলো। আমি যখন যেখানে যাই
ঐ এলাকার ঐতিহ্য একটু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা করি। অনেক যাওয়া হয়েছে
কক্রবাজার। কিন্তু একটি জিনিস স্বচক্ষে দেখার স্বাধ অনেক দিনের। এটা হলো
বাংলাদেশের একটা বৃহৎ শুঁকটির আড়ৎ কক্রবাজারের সদর উপজেলার ভিতরে হলেও একটু দূরে
নাজিরারটেক। টিপুকে বললাম চল। ও রাজি হলো। আমজাদ নাজিরার টেকে যাবার জন্য একটা
রিকশা ভাড়া করে দিলো। আমরা সকাল ১০টায় রওয়ানা দিলাম। নাজিরার টেকে পৌছতে লাগলো
১১টা। তারপর বিশাল সমুদ্র উপক’লে যে কয়েক শত একর জায়গা নিয়ে অবস্থিত এ রকম একটা শুঁটকি পল¬ী তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা অকল্পনীয়। যাই হোক আমরা এখান থেকে ওখানে
এরকম প্রায় ৩ ঘন্টা কাটিয়ে দেখলাম শুঁটকির আদি অন্ত রহস্য। কিভাবে মহিলারা একর পর
এক শুঁকটি বেছে বেছে তা রোদে শুকাবার উপযোগী করছে। পুরো এলাকার বাতাসে শুঁকটির
ঘ্রাণে ভরপুর। সাথে থাকা ক্যামেরার ফ্লাস ও জ্বলে উঠছে কিছুক্ষন পরপর। তারপর কথা
হলো ঐ এলাকার কয়েকজন শুঁটকি ব্যবসায়ী ও স্থানীয় লোকদের সাথে। তারা জানালো শুঁকটি
সম্পর্কে অনেক তথ্য। কক্সবাজার জেলার উপকূলীয় এলাকা মহেশখালীর সোনাদিয়া, গোরকঘাটা, তাজিয়াকাটা, কুতুবজোম, কুতুবদিয়া
উপজেলার বড়ঘোপ, খুদিয়ারটেক, আলী আকবর ডেইল,
অংজাখালী, পশ্চিম ধুরুং, টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, সেন্টমার্টিন, জালিয়াপাড়া, সদর
উপজেলার নাজিবারটেক,
খুরুশকুল, সমিতিপাড়া, চৌফলদণ্ডিসহ বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় বিপুল পরিমাণ শুঁটকি
তৈরি হয়। শুঁটকির
মধ্যে সবচেয়ে সামুদ্রিক রূপচাঁদা, ছুরি লাক্কা, কোরাল, সুরমা, লইট্যা, চিংড়ি
এবং মিঠাপানির মাছের মধ্যে শোল, কাচকি, কুচো চিংড়ি, মলা, গইন্যা, বাইলা, ফাইস্যাসহ
প্রায় ২০ প্রজাতির মাছের শুঁটকি হয়। কক্সবাজারে শুঁটকির শুকানোর সবচেয়ে বড় মহাল
কক্সবাজার শহর সংলগ্ন পশ্চিম সাগরের তীরে নাজিরারটেক। এটি নতুন চরএলাকা। বছরজুড়ে
এখানে চলে শুঁটকি মাছের উৎপাদন। প্রায় শত একরের বিশাল এলাকাজুড়ে শত শত বাঁশের
মাচায় নানা জাতের মাছ শুকানো হয়। কিন্তু এখানে শুঁটকি মাছ সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা
নেই। ফলে নষ্ট হয় অনেক মাছ। শুঁটকি মাছকে মাছি ও পোকামাকড় থেকে রক্ষা করার জন্য
এতে নানা ধরনের বিষাক্ত কীটনাশক, অতিরিক্ত লবণ ব্যবহার করা হয়। ফলে শুঁটকির গুণগত মান নষ্ট
হয়। উৎপাদনকারী ব্যবসায়ীরা জানান, আগে কীটনাশক ব্যবহার করা হলেও এখন তারা মাছ ভালো ভাবে
শুকিয়ে পলিথিনের প্যাকেটে সংরক্ষন করেন। ফলে শুঁটকির মান ভালো থাকে এবং নষ্ট হয়
না। সরেজমিনে দেখা গেছে,
শুঁটকি তৈরির জন্য মাছ শুকাতে দিলে মাছি ভনভন করে। ওই মাছে
মাছি ডিম পাড়ে। এই ডিম থেকে বাচ্চা ফুটে শুঁটকি খেয়ে নষ্ট করে দেয়। শুকানোর সময়
মাছি না বসার পদ্ধতি প্রয়োগ করা গেলে শুঁটকির মান অনেক উন্নত হবে বলে স্থানীয়রা
জানান। শুঁটকিতে বর্ষা মৌসুমে ব্যবহৃত কীটনাশকের মধ্যে রয়েছে নগস, মেলাথিয়ন, ডায়াজিনন, সুবিক্রন
এবং পাউডার জাতীয় কীটনাশক ডেসিফ। এসব শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। শীত মৌসুমে
বাতাস যখন উত্তর থেকে প্রবাহিত হয়, তখন মাছি বসলেও ডিম হয় না। এ সময়
ব্যবসায়ীরা কীটনাশকও ব্যবহার করেন না। নাজিরা
টেক ঘুরে দেখা গেছে,
কেজিপ্রতি লাক্ক্যা শুঁটকি বিক্রি হচ্ছে ১২শ’ টাকায়।
প্রতিটি লাক্ক্যা শুটকির ওজন হয় পাঁচ থেকে ছয় কেজি। এছাড়া রূপচাঁদা বিক্রি হচ্ছে
প্রতি কেজি ১২৫০ টাকা,
কালো চান্দা ৬০০টাকা কেজি। লইট্যা শুঁটকি প্রতি কেজি
২৫০-৩০০, ছুরি মাছের শুঁটকি ৪০০টাকা কেজি, কোরাল মাছের শুঁটকি কেজিপ্রতি
৮০০টাকা, পোয়া মাছের শুটকি ২০০টাকা কেজি, শোল মাছের শুঁটকি ৭০০ টাকা কেজি, সুরমা
মাছের শুঁটকি কেজি ৪৫০ টাকা, গইন্যা মাছের শুঁটকি ৩০০, ইলিশ শুঁটকি ৩০০, কামিলা
২৮০ , ইছা (চিংড়ি) ২৮০ থেকে ৩০০, ফাইস্যা শুঁটকি ১৫০, অলুয়া শুঁটকি ১২০, মইল্যা
শুঁটকি ১৪০, কাঁচকি শুটকি ২২০-২৫০,
পাঁচমিশালী ১০০-১৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
শুঁটকি
রফতানি করেও বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পরপর ‘৭২-৭৩’ সালে
শুঁটকি রফতানি খাতে যেখানে সরকারের আয় হতো ১৭ হাজার ৯শ’ টাকা, সেখানে
২০০৮-০৯ অর্থবছরে শুঁটকি রফতানি করে আয় হয়েছে ৩০ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এখন এর পরিমাণ
অর্ধশত কোটি টাকার বেশি। ব্যবসায়ীরা জানান, শুঁটকি রফতানি করে অনায়াসেই বছরে
শতকোটি টাকা আয় করা সম্ভব। আমরা যারা ভ্রমণ পিপাসু কক্রবাজারে যাই একটু কষ্ট হলেও
ঐ শুকটি পল¬ী যেন একটু দেখে আসি। না হলে অনেক মজার ও শেখার অপূর্ণতা থেকে যাবে।




কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন